সোমবার | ১৭ই মে, ২০২১ ইং | ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | গ্রীষ্মকাল | সকাল ৬:৫৩ | রেজিঃ নং-

সাফল্য ও অহংকারের প্রতিক রোকেয়া খাতুন

নিজস্ব প্রতিবেদক: আত্নবিশ্বাস আর নিজ সাফল্যে অহংকারের প্রতিক হয়ে দাঁড়িয়েছেন রোকেয়া খাতুন। ঢাকা ইডেন কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এই রোকেয়া খাতুন।স্বামী ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান। আদর্শ, দক্ষতা,অনুপ্রেরণা ও সচ্ছতা আর পেশাদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে দুই জনকে নিয়েই দেশ ও জাতি আজ গর্বিত।

কারণ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অবিস্মরণীয় ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে বিশ্ব স্বীকৃতিতে অন্য অনেকের চেয়ে একটু বেশিই আনন্দ ভোগ করেছিলেন ইডেন কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রোকেয়া খাতুনের। বিষয়টি তাঁর নজরে আসা মাত্রই এবং তিনি খবরটি পড়েই আনন্দে বেশ আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। আনন্দাশ্রু মুখমন্ডল বাইতেই যেন গর্বে ভরে উঠেছিল বুক। স্বীয় মনে নিজের গাঁথুনী মালায় অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন তিনি।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে আজ থেকে ছয় বছর আগে তিনিই প্রথম ইউনেস্কোয় তুলে ধরেছিলেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। একটি জাতি কি করে এক যাদুকরী ভাষণেই একটি দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পারে– সেটাই তিনি তুলে ধরেছিলেন ইউনেস্কোয়।

দেরিতে হলেও ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে সেই ভাষণের বিশ্ব স্বীকৃতি আর নিজেকে ইতিহাসের ‘ক্ষুদ্র’ অংশীদার হতে পেরেই যত আনন্দ রোকেয়ার।

জয়পুরহাটের মেয়ে রোকেয়া খাতুন (৪৩) ২০০৩ সালে ২২তম বিসিএসএসে যোগ দেন শিক্ষা ক্যাডারে। স্বামী ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান। স্বামীর কর্মসূত্রের সুবাদে ছিলেন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের প্রভাষক। তার বদলির সুবাদে চলে আসেন ঢাকায়। প্রথমে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। পরে ২০০৭ সালে প্রেষণে বদলি হয়ে প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোয়। ২০১১ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় কোরিয়ান ইউনেস্কো আয়োজিত ‘সেকেন্ড রিজিওনাল ট্রেনিং ওয়ার্কশপে অন দ্য ইউনেস্কো ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে’ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন রোকেয়া খাতুন।

স্বামীর সঙ্গে রোকেয়া খাতুনদায়িত্ব দেওয়া হয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঐতিহ্যগত গুরুত্ব আছে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে বাংলাদেশের এমন গুরুত্বপূর্ণ নথি বা প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপনের।

‘প্রথম দিকে স্থানীয় পর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম কাব্য তথা সাহিত্য নিদর্শন হিসেবে ‘চর্যাপদ’ তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিবর্তে তিনি এমন কিছু তুলে ধরার পরিকল্পনা করেন যা সত্যিকারভাবেই বিশ্বে ভিন্ন এক স্বীকৃতি লাভ করতে পারে। এক্ষেত্রে আমার স্বামী পুলিশ কর্মকর্তা শাহ মিজান শাফিউর রহমান আমাকে অসাধারণ অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। তিনিই পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, পৃথিবীর বুকে একমাত্র একজন নেতার একটি ভাষণই গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলো।’

সেটা বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। যে ভাষণ পুরো জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিল। শক্তি যুগিয়েছিল প্রতিরোধ যুদ্ধের। নয় মাসের সেই সশস্ত্র সংগ্রামের পর আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ইউনেস্কোর তালিকায় ঠাঁই পেতেও যে ভাষণের রয়েছে পর্যাপ্ত গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহাসিক প্রভাব।

রোকেয়া বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমি বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোর তৎকালীন সচিব আব্দুল খালেকের সঙ্গে আলোচনা করলে তিনি আমাকে যথেষ্ঠ উৎসাহ দেন। ব্যস, ঐতিহাসিক সেই ভাষণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আর প্রভাব বিশ্বের ফোরামে তুলে ধরতে শুরু হয় আমার গবেষণা। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরে ছোটাছুটি করি। নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে আমাকে যথেষ্ঠ সহযোগিতা করেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে আমি যোগ দেই ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় কোরিয়ান ইউনেস্কো আয়োজিত ‘সেকেন্ড রিজিওনাল ট্রেনিং ওয়ার্কশপ অন দ্য ইউনেস্কো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে’।

২০১১ সালের ১১ থেকে ১৪ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই কর্মশালায় বাংলাদেশ ছাড়াও অংশ নেয় ভুটান, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মিয়ানমার, পালাও, পাপুয়ানিউগিনি, ফিজি, সলেমন দ্বীপপুঞ্জ, পূর্ব তিমুরসহ ১১ দেশের প্রতিনিধিরা। উপস্থিত ছিলেন, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি ইউনেস্কার মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড (এমওডব্লিউ) এর তৎকালীন চেয়ারপারসন রোজলেন রাসেল, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের চেয়ারপারসন রে অ্যাডমন্ড সনসহ পাঁচজন বিশেষজ্ঞ।

সেখানে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় ৭ মার্চের ভাষনেণের ওপর আমার উপস্থাপনা প্রশংসা পায়। এর মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের চেয়ারপারসন রে অ্যাডমন্ডসন আমার উপস্থাপনের ভূয়সী প্রশংসা করে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সেই অবিস্মরণীয় ভাষণের গুরুত্ব উপস্থানে বেশকিছু মতামত ও পর্যবেক্ষণ দেন। থাইল্যান্ডের মি. আবহাকর্ন মনোনয়ন আরও শক্তিশালী করতে ভাষণের পিছনের ব্যক্তি- ক্যামেরা, শব্দগ্রহণ প্রভৃতি কাজে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের যুক্ত করার পরামর্শ দেন।

ইউনেস্কোর কাছে উপস্থাপনের সেই দলিল বাংলানিউজের কাছে তুলে ধরছেন রোকেয়াবিশ্বব্যাপী আর্থ-সামাজিক অস্থিরতা, যুদ্ধের হুংকার, প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানে ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে এমন সম্পদ যখন বিনষ্টের পথে, গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অনেক দলিল যখন নষ্টের ঝুঁকিতে, সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালে মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড প্রোগ্রাম চালু করে ইউনেস্কো। সেই ফোরামে বিষয়টি প্রথম উপস্থাপনের ছয় বছর পর সেই ভাষণের বিশ্বস্বীকৃতিতে সত্যিই গর্বে বুক ভরে যায়। আবেগতাড়িত হয়ে একানাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলেন তিনি।

‘দীর্ঘদিন পর হলেও বঙ্গবন্ধুর সেই যাদুকরী ভাষণের বিশ্বস্বীকৃতি বাংলাদেশকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিলো। আমি সেই প্রয়াসের ক্ষুদ্র অংশ হতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। যখন প্রথম এই আনন্দ ঘোষণা শুনেছি, তখনই আনন্দে আত্মহারা হয়েছি।’

বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোর তৎকালীন সচিব আব্দুল খালেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, রোকেয়া খাতুন প্রথম প্রতিনিধিত্ব করে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সেই অবিস্মরণীয় ভাষণের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। এভাবে আমরা শুরুটা করেছিলাম। আজ বিশ্বস্বীকৃতিতে বাংলাদেশি হিসেবে আমরা গর্ব করছি। এটা আমাদের জন্য অহংকার। জাতি হিসেবে আমরাও বঙ্গবন্ধুর জন্য গর্বিত।

জয়পুরহাট জেলার নতুনহাট সরদারপাড়ার সরদার মমতাজুস সামাদের মেয়ে রোকেয়া খাতুন। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে দ্বিতীয় রোকেয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ থেকে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। স্বামী ২০তম বিসিএস’র পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান। ব্যক্তিগত জীবনে এক পুত্র এক কন্যা সন্তানের জননী।

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৪৬ বছর আগে সেই ভাষণে স্বাধীনতাকামী ৭ কোটি বাঙালিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড (এমওডব্লিউ) কর্মসূচির অধীনে আন্তর্জাতিক তালিকায় (ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার) মোট ৭৮টি দলিলকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। যে তালিকায় ৪৮ নম্বর স্থানে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ।

পর্যাপ্ত গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহাসিক প্রভাব থাকতে হয়- বিশ্ব ঐতিহ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আন্তর্জাতিক এমন তালিকাই মূলত মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার ইতিহাস সংরক্ষণ ও সবার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে আসছে ইউনেস্কো।

Comments are closed.



সম্পাদক ও প্রকাশক:

মোঃ সহিদুল ইসলাম (সহিদ)

প্রধান কার্যালয়ঃ

বার্তা বিভাগঃ এস,এ পরিবহনের পিছনে
উত্তর তেমুহনী বাসষ্ট্যান্ড, সদর, লক্ষ্মীপুর।

সম্পাদকীয়ঃ বিআরডিবি ওয়ার্কশফ ভবন
বাগবাড়ী, সদর, লক্ষ্মীপুর।

ই-মেইলঃ newsdailyrob@gmail.com, মোবাইলঃ 01712256555, 01620759129

Copyright © 2016 All rights reserved www.rnb24.com

Design & Developed by Md Abdur Rashid, Mobile: 01720541362, Email:arashid882003@gmail.com